আল-কুরআন অবতরণ

আল-কুরআন অবতরণ - বঙ্গ টুইট - Bongo Tweet

আল-কুরআন সর্বপ্রথম লাওহে মাহফুজ বা সুরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ ছিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন - "বরং এটা মহান কুরআন, সুরক্ষিত ফলকে সংরক্ষিত (সুরা আল-বুরজ: ২১-২২)। 

তারপর আল্লাহ তায়ালা লাওহে মাহফুজ থেকে কুরআন অবতরণের সূচনা করেন। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স) হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাবস্থায় মহান আল্লাহর নির্দেশে জিবরাইল (আ) আল-কুরআনের সুরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নিয়ে মহানবি (স) এর কাছে অবতরণ করেন। সে সময় জিবরাইল (আ) মহানবি (স)কে বললেন, পড়ন। তিনি বললেন, আমিতাে পড়তে জানি না। নবি (স) বলেন, জিবরাইল (আ) আমাকে চেপে ধরলেন, তারপর ছেড়ে দিয়ে আবার বললেন, পড়ুন আপনার প্রভুর নামে- যিনি মানুষকে জমাট বাঁধা রক্ত হতে সৃষ্টি করেছেন (সহিহ বুখারি)।

কুরআন অবতরণের প্রাথমিক এ ঘটনার পর তিন বছর পর্যন্ত সরাসরি আর কোনাে ওহি তথা প্রত্যাদেশ বাণী অবতীর্ণ হয়নি। ওহি বিরতির এ কালকে ফাতরাহ নামে অবহিত করা হয়।

লাওহে মাহফুজ থেকে নবি করিম (স) পর্যন্ত কীভাবে এ মহাগ্রন্থের নাজিল সম্পন্ন হয়েছে সে বিষয়ে একাধিক অভিমত লক্ষ করা যায়।

ক. সাঈদ বিন জুবায়র (রা), আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) ও ইকরামা বিন আব্দুল্লাহ (র) বলেন, "লাওহে মাহফুজ থেকে সমগ্র কুরআন কোনাে এক কদরের রাতে পৃথিবীর আকাশের 'বায়তুল ইযযাহ' নামক স্থানে নাজিল হয়। বায়তুল ইযযাহ হলাে বায়তুল মামুরের অপর নাম। এটি বায়তুল্লাহ বরাবর পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশে ফেরেশতাদের ইবাদতগৃহ। আল্লাহ বলেন - "সুনিশ্চিতভাবেই এ কুরআনকে আমি কদর রাতে নাজিল করেছি (সুরা কাদর: ১)

এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে রাসুল (স)-এর প্রতি ধীরে ধীরে প্রয়ােজন মতাে অল্প অল্প অংশ নাজিল হয়ে দীর্ঘ তেইশ বছরে এ নাজিল প্রক্রিয়া পূর্ণতা পায় (আল-ইতকান, বায়হাকি)

খ. আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী (র) বলেন, 'লাওহে মাহফুজ থেকে কুরআন মাজিদ বায়তুল ইযযাতে নাজিল হয়েছে ঠিকই কিন্তু সমগ্র কুরআন নয়। বরং প্রতি বছরের কদর রাতে সে বছরের জন্য প্রয়ােজনীয় অংশই কেবল পৃথিবীর আকাশে নাজিল হতাে (আত-তিবইয়ান ফী উলূমিল কুরআন)

গ. ইমাম সাবী (র)-এর মতে, লাওহে মাহফুজ থেকে সরাসরি আল-কুরআন প্রয়ােজন অনুসারে নবি (স)-এর ওপর নাজিল হয়। কদর রাতে এ মহাগ্রন্থের অবতরণ শুরু হয় (মাবাহিস ফী উলূমিল কুরআন)

আরও পড়ুনঃ

ঘ. ইমাম আল মাওয়াদী (র) বলেন, কুরআন সংরক্ষণকারী ফেরেশতারা সমগ্র কুরআন লাওহে মাহফুজে নাজিল করেন। এখান থেকে প্রতি বছর কদরের রাতে পরবর্তী কদর পর্যন্ত প্রয়ােজনীয় অংশ জিবরাইল (আ)-এর ওপর নাজিল হয়। আর জিবরাইল (আ) পর্যায়ক্রমে তা রাসুলুল্লাহ (স)-এর কাছে পৌছে দেন (আল ইতকান)

দ্বিতীয় পর্যায়ে রাসুলুল্লাহ (স)-এর কাছে আল-কুরআন অবতরণের ব্যাপারে নানারকম পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বিভিন্নভাবে পদ্ধতিগুলাের ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। যেমন -

১. স্বপ্নযােগে: নবি করিম (স) স্বপ্নযােগে ওহি লাভ করতেন। হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন - "রাসুলুল্লাহ (স)-এর কাছে প্রথম ওহির সূচনা হয়েছিল ঘুমন্ত অবস্থায় সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে (সহিহ বুখারি)

২. ঘণ্টাধ্বনিতে: হযরত হারিস বিন হিশাম (রা) কীভাবে ওহি নাজিল হয় জানতে চাইলে নবি করিম (স) বলেন - "আমার কাছে ঘণ্টাধ্বনির মতাে ওহি আসে। আর তা আমার জন্য সবচেয়ে কষ্টকর মনে হয় (সহিহ বুখারি)।

৩. জিবরাইল (আ) সরাসরি: জিবরাঈল (আ) সরাসরি রাসুলুল্লাহ (স)-এর অন্তরে আল্লাহর কালাম ঢেলে দিতেন। কুরআনে এসেছে - "বিশ্বস্ত ফেরেশতা এ কুরআন নিয়ে অবতরণ করেছেন আপনার অন্তরে" (সুরা আশ-শুআরা: ১৯৩-১৯৪)

৪. জিবরাইল (আ) নিজস্ব আকৃতিতে: জিবরাঈল (আ) নিজস্ব আকৃতিতে আল্লাহর বাণী নিয়ে আসতেন। ইরশাদ হয়েছে - "আর তিনি সেই ফেরেশতাকে প্রকাশ্য দিগন্তে দেখেছেন (সুরা আত-তাকভির: ২৩)। নিজস্ব আকৃতিতে জিবরাইল (আ) ওহি নিয়ে এসেছেন মাত্র তিনবার (ফতহুল বারী)

৫. জিবরাইল (আ) মানুষের বেশে: জিবরাইল (আ) মানুষের বেশে আগমন করে রাসুল করিম (স)-এর কাছে কুরআনের আয়াত পৌছে দিতেন। নবি (স) বলেন - "ফেরেশতা পুরুষের আকৃতিতে আমার কাছে ওহি নিয়ে আসত (সহিহ বুখারি)। এ সময় তিনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাহাবি দাহিয়া কালবী (রা)-এর আকৃতি ধারণ করতেন। নবি (স)-এর কাছে এ পদ্ধতিতে ওহি নাজিলই সর্বাধিক সহজ মনে হতাে (আল-ইতিকান)।

৬. সরাসরি আল্লাহর সাথে বাক্যালাপের মাধ্যমে: এ বিশেষ মর্যাদা নবি করিম (স) জেগে থাকা অবস্থায় মাত্র একবার মিরাজের রাতে লাভ করেছিলেন। অবশ্য অন্য একবার স্বপ্নযােগেও তিনি মহান আল্লাহর সাথে কথোপকথন করেছিলেন (আল-ইতকান)।

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন