আদর্শ জীবন গঠনে আল-কুরআনের ভূমিকা

আদর্শ জীবন গঠনে আল কুরআনের ভূমিকা - বঙ্গ টুইট - Bongo Tweet

কুরআন মাজিদ বিশ্বমানবের সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবননির্বাহের আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-ব্যবস্থাপনা। মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ব্যক্তিজীবন হতে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক জীবন অবধি, জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ও বিভাগে মানব সমস্যার অন্ত নেই। অবশ্য মহান স্রষ্টা আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম সৃষ্টি মানবজাতিকে সমস্যার মধ্যে অসহায়ভাবে ফেলে রাখেননি। মানবজাতিকে এ সমস্যার আবর্ত হতে পরিত্রাণ করে সুষ্ঠ-শান্তিময় ও উদ্বেগহীন জীবন পরিচালনার জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অগণিত নবি ও রাসুল প্রেরণ করেছেন এবং জীবন সমস্যার সমাধান হিসেবে তাদেরকে দান করেছেন আসমানি কিতাব। এ ধারায় সর্বশেষ নবি ও বিশ্বনেতা হযরত মুহাম্মদ (স) এর প্রতি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব আল-কুরআন নাজিল করেছেন। তিনি মানবজীবনের সর্ববিধ সমস্যার সমাধান এই মহাগ্রন্থে উপস্থাপন করেছেন। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, "আর আমি তােমার ওপর কিতাব নাজিল করেছি, যা প্রতিটি বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা সম্বলিত, হেদায়েত, রহমত এবং সুসংবাদ-মুসলিম জাতির জন্য (সুরা নাহল: ৮১)

রাসুলুল্লাহ (স) তাঁর বিদায় হজের ভাষণে এজন্যই বলেছেন আমি তােমাদের মাঝে দুটো বিষয় রেখে যাচ্ছি। যদি তােমরা এ দুটোকে আঁকড়ে ধর, কখনােই পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলাে আল্লাহর কিতাব এবং অপরটি তাঁর রাসুলের সুন্নত' (মিশকাত)।

ব্যক্তিজীবনে আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আল-কুরআনের ভূমিকা

ব্যক্তি বৃহত্তর মানবসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তা সত্ত্বেও তার নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। ব্যক্তির বিশ্বাস, কার্যক্রম, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমা নির্ধারণ এবং কাজের জন্য ব্যক্তিকে স্বতন্ত্রভাবে দায়ী করে কুরআন ব্যক্তিজীবনের সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছে। এজন্য প্রথমেই ব্যক্তিকে কুফর, শিরক, পৌতলিকতা প্রভৃতি অসার বিশ্বাস থেকে আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদ, রিসালাত এবং আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস পােষণের আহ্বান জানিয়েছে। আল্লাহ বলেন - "তােমরা আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনবে (সুরা আছ-ছফ: ১১)

নিজেকে বিশ্বাসী মানুষে পরিণত করা, সদাচার ও ন্যায়-নিষ্ঠায় অভ্যস্ত করা ব্যক্তির নিজের জন্য জরুরি। এ মর্মে আল্লাহ ঘােষণা করেছেন, "যে সৎকাজ করল, তা করল তার নিজের জন্য আর যে খারাপ কাজ করল, তার পরিণামও তার ওপরেই বর্তাবে" (সুরা আল-জাসিয়া: ১৫)। 

তিনি আরও বলেন -  "যে হেদায়েতের পথে চলবে, তা হবে তার নিজের জন্য কল্যাণকর। আর যে ভ্রান্ত পথে চলবে, তার গোমরাহির জন্য সে নিজেই দায়ী। কোনাে বােঝা বহনকারী অন্যের বােঝা বহন করবে না (সুরা বনি-ইসরাইল: ১৫)। 

কর্মাবিমুখতা ও বৈরাগ্য ব্যক্তিজীবনের অন্যতম সমস্যা। কুরআন ব্যক্তিকে সংসারী, ধার্মিক এবং কর্মমুখর হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে এ সমস্যার নিরসন করে। আল্লাহ বলেন - "আর বৈরাগ্য, সেতাে তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছে। আমি এটা তাদের ওপর ফরজ করিনি" (সুরা আল-হাদিদ: ২৭)

আল্লাহ তায়ালা আরাে বলেন - "আর নারীদের মধ্যে যাকে তােমাদের ভালাে লাগে তাকে বিয়ে কর" (সুরা আন নিসা: ৩)

আল্লাহ আরাে বলেন - "এরপর সালাত শেষ হলে তােমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়, আর আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করাে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করাে, যাতে তােমরা সফলকাম হও" (সুরা আল-জুমুআ: ১০)

আদর্শ পরিবার গঠনে আল-কুরআনের ভূমিকা

মাতা-পিতা, সন্তান-সন্ততি, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বােন সবাইকে নিয়ে মুসলিম পরিবার গড়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, ভালােবাসা, সহানুভূতি, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি এবং সর্বাত্মক সহযােগী মনােভাব প্রতিষ্ঠাই এ সংস্থার মূল লক্ষ্য। পরিবার তথা স্বজনদের প্রতি দায়িত্ব পালন বিষয়ে কুরআনের প্রথম হেদায়েত হচ্ছে - "আর নিকটাত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও" (সুরা বনি-ইসরাইল: ২৬)

কুরআন বিভিন্নভাবে নিকটাত্মীয়দের নানা রকমের হক নির্ধারণ করে দিয়ে তা আদায়ের পথ নির্দেশ করেছে। আল্লাহ বলেছেন - "হে মুমিনগণ! তােমরা নিজেদের এবং তােমাদের পরিজনদের আগুন থেকে রক্ষা করাে" (সুরা আত্-তাহরম: ৬)

কুরআনে পরিবারের সদস্যদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদাভাবে পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দেশ করা হয়েছে। যেমন: মাতা-পিতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে- "আর মাতা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুবছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়ানাের মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়। আর পিতার দায়িত্ব হলাে সন্তানের মাতাদের সঠিকভাবে ভরণ-পােষণ প্রদান করা" (সুরা আল বাকারা: ২৩৩)

সন্তানদের জন্য নির্দেশনা এসেছে- "আর মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ কর। তাদের একজন কিংবা উভয়ই যদি তােমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয় তাহলে তাদের 'উহ' শব্দটিও বলাে না, তাদের ধমক দিয়াে না এবং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলাে (সুরা বনি-ইসরাইল; ২৩)। 

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার নির্দেশ করে বলা হয়েছে- "আর স্ত্রীদের ওপর স্বামীদের যেমন অধিকার আছে, তেমনি স্ত্রীদেরও স্বামীদের ওপর অধিকার রয়েছে" (সুরা আল-বাকারা: ২২৮) এভাবে কুরআন পারিবারিক সমস্যা সমাধানের প্রয়াস পেয়েছে।

আদর্শ সমাজ গঠনে আল-কুরআনের ভূমিকা

মানুষ সামাজিক জীব। আত্মীয়-অনাত্মীয়, মুসলিম-অমুসলিম পাড়া-প্রতিবেশী নিয়ে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে তাকে সামাজিক জীবননির্বাহ করতে হয়। অবিচার, জুলুম, অধিকার আত্মসাৎ, হত্যা, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, ব্যভিচার ও নানারকম খারাপ আচরণ সামাজিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তােলে। এ সমস্যা নিরসনে কুরআন ঘােষণা দিয়েছে: আল্লাহ বলেন - 

ক. তােমরা ন্যায়বিচার করাে। তা তাকওয়ার সর্বাধিক নিকটবর্তী (সুরা আল-মায়েদা: ৮)

খ. মুমিনগণ! তােমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাক। আল্লাহর জন্য ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান করাে। যদিও তা তােমাদের নিজেদের বা তােমাদের মাতা-পিতা ও নিকটাত্মীয়দের ব্যাপারে হয় (সুরা আন-নিসা: ১৩৫)

গ. আর মাতা-পিতার সাথে ভালাে ব্যবহার করাে; নিকটাত্মীয়, এতিম ও মিসকিনদের প্রতিও এবং প্রতিবেশী আত্মীয়ের প্রতি, অনাত্মীয় প্রতিবেশীর প্রতি, পাশাপাশি চলার সাথী ও পথিকের প্রতি এবং তােমাদের অধীনস্থ ক্রীতদাস ও দাসীদের প্রতি দয়ানুগ্রহ প্রদর্শন কর। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক ও গর্বকারীকে ভালােবাসেন না (সুরা আন-নিসা: ৩৬)

ঘ. মুমিনগণ! তােমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ আত্মসাৎ করাে না (সুরা আন-নিসা: ২৯)

ঙ. আর এমন কাউকে হত্যা করাে না, যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন। অবশ্য ন্যায়সঙ্গত হত্যার কথা স্বতন্ত্র (সুরা বনি-ইসরাইল: ৩৩)

চ. আর পুরুষ ও মহিলা চোর; উভয়ের হাত কেটে দাও। এটি তাদের কর্মের পরিণাম এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবাণী। আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময় (সুরা আল মায়িদা:,৩৮)

ছ. ব্যভিচারী পুরষ ও মহিলা তাদের প্রত্যেককে একশত করে বেত্রাঘাত করাে। আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে তাদের প্রতি তােমাদের মনে যেন করুণা জেগে না ওঠে, যদি তােমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলিমদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে (সুরা আন-নুর; ২)

এমনভাবে সহানুভূতি, সদাচার ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে কুরআন মাজিদ মানুষের সামাজিক জীবনকে সমস্যামুক্ত ও শান্তিপূর্ণ করার সামগ্রিক বিধান দিয়েছে।

আদর্শ জাতি গঠনে আল-কুরআনের ভূমিকা

জাতীয় জীবনের মূল সমস্যা অনৈক্য, আস্থাহীনতা এবং জাতীয় দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রদর্শন। এ সমস্যা মূলােৎপাটিত করতে মুসলিম জাতিকে কুরআন নির্দেশনা দিয়েছে। আল্লাহ বলেন - "আর তােমরা আল্লাহর পথ ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধর এবং বিচ্ছিন্ন হয়াে না" (সুরা আলে ইমরান: ১০৩)। 

এ ঘােষণায় কুরআন বিভক্তি, অনৈক্য, দায়িত্বহীনতা প্রভৃতি জাতীয় সমস্যার সর্বাধিক কল্যাণকর সমাধান দেয়।

আরও পড়ুনঃ

আন্তর্জাতিক জীবনে আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আল-কুরআনের ভূমিকা

বর্ণ ও অঞ্চলগত সংঘাত আন্তর্জাতিক জীবনের মূল সমস্যা। এছাড়াও সাম্রাজ্য বিস্তারের অশুভ বাসনা, জবরদখল, যুদ্ধ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড বিশ্ব পরিস্থিতিকে অশান্ত করে রাখে। কুরআন সব কালের ও বিশ্বের সব দেশের মানুষদের একই বংশােদ্ভূত ঘােষণা দিয়ে দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে, বর্ণ ও অঞ্চলগত সংঘাত বন্ধের জোরালাে তাগিদ দিয়েছে। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন, "হে মানুষ, আমি তােমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। পরে তােমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গােত্রে, যাতে তােমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারাে। তােমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাশীল যে অধিক মুক্তাকি (আল্লাহভীর)" (সুরা আল-হুজুরাত: ১৩)

শাস্তি বজায় রাখতে কুরআন শান্তিচুক্তি বা সন্ধির নির্দেশনা দিয়েছে। আল্লাহ বলেন - "আর যদি তারা সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সেদিকে আগ্রহী হও এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করাে। নিঃসন্দেহে তিনি সবকিছু শােনেন, সবকিছু জানেন (সুরা আনফাল: ৬১)। 

এমনকি মুসলিম জাতি বা রাষ্ট্রকে সাহায্য করার ক্ষেত্রেও চুক্তির মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। যেমন - "আর যারা হিজরত করেনি এমন মুমিনগণ যদি দীনের ব্যাপারে তােমাদের কাছে সাহায্য চায়, তবে তাদেরকে সাহায্য করা তােমাদের কর্তব্য। কিন্তু সে জাতির বিরুদ্ধে নয় যাদের সাথে তােমাদের চুক্তি আছে" (সুরা আনফাল; ৭২)

ধর্মীয় জীবনে আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আল-কুরআনের ভূমিকা

ধর্ম নিয়ে সংঘাত, রক্তপাত ও বাড়াবাড়ি বিভিন্ন ধর্মানুসারী মানুষদের জীবন দুর্বিষহ করে রেখেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা মানুষের জীবন অশান্তিপূর্ণ করে তুলেছে। এর সমাধানকল্পে কুরআন স্পষ্ট ভাষায় ঘােষণা করেছে - "দীনের ব্যাপারে কোনাে জবরদস্তি নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়েত গােমরাহি থেকে পৃথক হয়ে গেছে (সুরা আল-বাকারা: ২৫৬)

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আল-কুরআনের ভূমিকা

সম্পদের অসম বণ্টন, উপার্জনে ও ব্যয়ে হারাম পদ্ধতি অনুসরণ, সম্পদ আত্মসাৎ, সুদ প্রভৃতি হচ্ছে মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যা। এজন্য মানুষকে হালাল জীবিকা উপার্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে - "তােমরা পৃথিবীর যা হালাল ও পবিত্র, তা আহার করাে (সুরা আল-বাকারা: ১৬৮)

"আমি তােমাদেরকে জীবিকা হিসেবে যা দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার করাে" (সুরা আল-বাকারা: ১৭২)

অপচয় নিষিদ্ধ করে বলা হয়েছে - "তােমরা খাও ও পান করাে। কিন্তু অপচয় করাে না" (সুরা আল-আরাফ: ৩১)। 

আর অপব্যয় করাে না, নিশ্চয় অপব্যয়ীরা শয়তানের ভাই' (সুরা বনি ইসরাইল: ২৬-২৭)। 

ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার ঘােষণা করে আল্লাহ বলেছেন - "আর তাদের সম্পদে প্রার্থনাকারী ও বঞ্জিতদের হক রয়েছে (সুরা আয-যারিয়াত: ১৯)

অসম অর্থবন্টন রােধে আল্লাহ জাকাত প্রথার প্রবর্তন করেছেন। কুরআনে এসেছে - "আর তােমরা সালাত কায়েম করো ও জাকাত আদায় করাে (সুরা আল-বাকারা: ৪৩)। 

সর্বোপরি অর্থব্যবস্থাকে শােষণমুক্ত রাখতে সুদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে ইরশাদ হয়েছে - "আর আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন ও সুদকে হারাম করেছেন" (সুরা আল-বাকারা: ২৭৫) এভাবে অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে কুরআন মাজিদ অনবদ্য ভূমিকা পালন করে। 

আদর্শিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চায় আল-কুরআনের ভূমিকা

নীতি-আদর্শহীন শিক্ষা এবং অশালীন সংস্কৃৃতির চর্চা শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের মূল সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে কুরআন সবার জন্য শিক্ষাগ্রহণ ফরজ করেছে এবং নিষিদ্ধ করেছে সব অশালীন আচরণ। আল্লাহ বলেন - "পড় তােমার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন (সুরা আলাক: ১)

"বলাে সুনিশ্চিতভাবেই আমার প্রভু সব অশালীনতা ও অশ্লীলতা হারাম করেছেন (সুরা আল-আরাফ: ২৮)। 

কুরআনে জ্ঞানী এবং অশিক্ষিতদের মধ্যে মর্যাদার সুস্পষ্ট বিভেদরেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন - "যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে? অশালীন সংস্কৃতিচর্চা নিষিদ্ধ করে ঘােষণা করা হয়েছে- "যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার বিস্তার কামনা করে নিশ্চয়ই দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্য কঠিন শান্তি রয়েছে (সুরা আন-নুর: ১৯)

নৈতিক জীবন গঠনে আল-কুরআনের ভূমিকা

নৈতিক অধঃপতন এমন এক সমস্যা যা মানবজাতির ধ্বংস ডেকে আনে। এ সমস্যা থেকে মুক্তিলাভের জন্য কুরআন মানুষকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে - "আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রং এর চাইতে উত্তম রং আর কার হতে পারে? (সুরা আল-বাকারা: ১৩৮)।

মানুষকে নৈতিক স্খলন ও নীতিহীনতা থেকে রক্ষার জন্য কুরআনে সব রকমের পাপাচার, বিদ্রুপ উপনামে ডাকা, দোষারােপ, দোষান্বেষণ, ভিত্তিহীন অনুমান, গিবত, অন্যায় ও অশালীন কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

আধ্যাত্মিক জীবনে আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আল-কুরআনের ভূমিকা

কুরআন মানুষের দুটি সত্তার কথা উল্লেখ করেছে। একটি দেহ, অন্যটি রূহ বা আত্মা। পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া এবং সত্যিকারের সাফল্যলাভের জন্য মানুষকে তাই দৈহিক ইবাদত ও পবিত্রতার পাশাপাশি রূহের ইবাদত ও পবিত্রতাও অর্জন করতে হয়। সে কারণে কুরআন আধ্যাত্মিক বা আত্মিক সমস্যা নিরসনেও যথার্থ উদ্যোগ নিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে - "যে নিজেকে শুদ্ধ করে সেই সফল হয় আর যে নিজেকে কলুষিত রাখে সে ব্যর্থ হয়" (সুরা আশ-শামস: ৮-৯)

পার্থিব জীবনে উত্তম আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আল-কুরআনের ভূমিকা

কুরআনে পার্থিব জীবনকে উপেক্ষা করতে বলা হয়নি। কেননা পার্থিব জীবনের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করেই পরকালীন সাফল্য-ব্যর্থতা নির্ধারিত হবে। যেমন বলা হয়ে থাকে - "দুনিয়া আখিরাতের শস্যক্ষেত্র।"

আল্লাহ তায়ালা বলেন - "আমাদের প্রভু। আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন" (সুরা আল-বাকারা: ২০১)

পরকালীন জীবনে শাস্তি ও মুক্তির ক্ষেত্রে আল-কুরআনের ভূমিকা

পার্থিব জীবন ক্ষণস্থায়ী। পার্থিব জীবনাবসানের পর মানুষ পরকালের অনন্ত জীবনে প্রবেশ করে। আর সে সফল অনন্ত জীবনের জন্য দরকার ইহকালের কৃতকার্যতা। এ জীবনে ব্যর্থ হওয়া মানেই চিরস্থায়ী ধ্বংসে পতিত হওয়া। এজন্য আল-কুরআন পরকালীন জীবনকে যথাযথ গুরত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। আল্লাহ বলেন, "তােমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ খুবই নগণ্য (সুরা আত-তাওবা: ৩৮)। 

বস্তুত আল্লাহর কাছে পরকালমুখী চেষ্টা-সাধনাই গ্রহণযােগ্য। ইরশাদ হয়েছে - "আর যারা পরকাল কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, এমন লােকদের চেষ্টাই স্বীকৃত হয়ে থাকে" (সুরা বনি-ইসরাইল: ১৯)।

কাজেই প্রতীয়মান হয় যে, মানবজীবনের সব দিক ও বিভাগের যাবতীয় সমস্যা সমাধানে আল-কুরআন অভ্রান্ত ও কল্যাণময় নির্দেশনা দিয়েছে। বাস্তবজীবনে এ নির্দেশনার অনুশীলন ও অনুসরণ করা হলেই প্রকৃত শান্তি ও মুক্তিলাভ সম্ভব হবে।

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন