পেশাদার ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেওয়া যাবে কি?

পেশাদার ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেওয়া যাবে কি?

অনেকে জিজ্ঞাসা করেন যে, পথেঘাটে চলার সময় যেসব লোক মানুষের কাছে ভিক্ষা চায় তাদেরকে ভিক্ষা দেওয়া যাবে কি না? এদের মধ্যে অনেকে আছে পেশাদার ভিক্ষুক, যারা ভিক্ষাবৃত্তিকেই নিজেদের উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। আবার অনেক লোক আছে প্রতিবন্ধী, যারা অন্ধ বা হাত-পা অচল কিংবা কাটা। তাদের অনেকের পক্ষে ভিক্ষা ছাড়া কোন উপায়ও নেই। অবশ্য ভিক্ষুকদের মধ্যে এ ধরনের লোকের সংখ্যা খুবই কম। এ অবস্থায় ভিক্ষুকদেরকে ভিক্ষা দেওয়ার হুকুম কী? তাদেরকে ভিক্ষা দেওয়া থেকে বিরত থাকাই কি উচিত হবে? নিম্নে এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো। 

পেশাদার ভিক্ষুক বলতে মূলত এমনসব লোককে বুঝানো হয়, যারা অর্থ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পেশা হিসেবে ভিক্ষা করে। প্রয়োজন ও অভাব-অনটন এর কারণে ভিক্ষা করে না। এ ধরনের লোকের জন্য ভিক্ষা চাওয়া ও তাকে জেনেশুনে ভিক্ষা দেওয়া কোনটিই জায়েয নয়। এদেরকে ভিক্ষা দিলে গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার দরুন দাতাও গুনাহগার হবে। 

হাদীস শরীফে আছে। হযরত আবু হুরায়রা رضى الله عنه থেকে বর্ণিত। নবীজী ﷺ ইরশাদ করেন-

مَنْ سَأَلَ النَّاسَ أَمْوَالَهُمْ تَكَثُّرًا فَإِنَّمَا يَسْأَلُ جَمْرًا فَلْيَسْتَقِلَّ أَوْ لِيَسْتَكْثِرْ

‘যে ব্যক্তি সম্পদ বাড়ানোর জন্য লোকদের কাছে ভিক্ষা চায়, সে যেন আগুনের অঙ্গার ভিক্ষা করে। সুতরাং চাইলে সে তা কম করুক বা বেশী করুক।’ -সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৪১

অপর এক হাদীসে অভাব-অনটন কোন পর্যায়ে পৌঁছলে ভিক্ষা করা বৈধ হয়- তা বর্ণিত হয়েছে। হযরত সাহল ইবনুল হানযালিয়া رضى الله عنه বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-

مَنْ سَأَلَ وَعِنْدَهُ مَا يُغْنِيهِ فَإِنَّمَا يَسْتَكْثِرُ مِنْ جَمْرِ جَهَنَّمَ. قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا يُغْنِيهِ؟ قَالَ: قَدْرُ مَا يُغَدِّيهِ وَيُعَشِّيهِ.

‘যে ব্যক্তি নিজের কাছে প্রয়োজন পরিমাণ সামগ্রী থাকা সত্ত্বেও অন্যের নিকট কিছু চায় সে জাহান্নামের জ্বলন্ত অঙ্গার বাড়িয়ে নিতে চায়। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! প্রয়োজন পরিমাণ সামগ্রীর সীমা কী? তিনি বলেন, যার নিকট সকাল ও সন্ধ্যার প্রয়োজন পূরণের মতো সম্পদ রয়েছে।’ -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১৭৬২৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস: ৫৪৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ১৬২৯

অপর এক হাদীসে তিন শ্রেণীর অনন্যোপায় লোক ছাড়া সকলের জন্য ভিক্ষাবৃত্তিকে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। 
হযরত কাবীসা ইবনে মাখারিক رضى الله عنه থেকে বর্ণিত।রসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন-

إِنَّ الْمَسْأَلَةَ لاَ تَحِلُّ إِلاَّ لأَحَدِ ثَلاَثَةٍ: رَجُلٍ تَحَمَّلَ حَمَالَةً فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ حَتَّى يُصِيبَهَا ثُمَّ يُمْسِكُ، وَرَجُلٍ أَصَابَتْهُ جَائِحَةٌ اجْتَاحَتْ مَالَهُ فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ حَتَّى يُصِيبَ قِوَامًا مِنْ عَيْشٍ - أَوْ قَالَ: سِدَادًا مِنْ عَيْشٍ -، وَرَجُلٍ أَصَابَتْهُ فَاقَةٌ حَتَّى يَقُومَ ثَلاَثَةٌ مِنْ ذَوِي الْحِجَا مِنْ قَوْمِهِ لَقَدْ أَصَابَتْ فُلاَنًا فَاقَةٌ فَحَلَّتْ لَهُ الْمَسْأَلَةُ حَتَّى يُصِيبَ قِوَامًا مِنْ عَيْشٍ - أَوْ قَالَ سِدَادًا مِنْ عَيْشٍ -، فَمَا سِوَاهُنَّ مِنَ الْمَسْأَلَةِ يَا قَبِيصَةُ سُحْتًا يَأْكُلُهَا صَاحِبُهَا سُحْتًا.

‘তিন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও জন্য ভিক্ষা করা বৈধ নয় : ১. ঐ ব্যক্তি, যে কারো দায়ভার বহন করে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তার ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত যাঞ্ছা করা বৈধ হবে। তারপর সে বিরত থাকবে। ২. ঐ ব্যক্তি, যার ধন-সম্পদ কোনো বিপর্যয় ধ্বংস করে দিয়েছে। তার জীবিকা নির্বাহের কোনো উপায় না পাওয়া পর্যন্ত ভিক্ষা করা বৈধ। ৩. আর যে ব্যক্তি ভীষণ অভাবগ্রস্ত এবং তার গোত্রের তিনজন লোক তার সম্পর্কে এ সাক্ষ্য দেয় যে, সে ব্যক্তি অবশ্যই অভাবগ্রস্ত। তার জীবিকা নির্বাহের কোনো উপায় না পাওয়া পর্যন্ত ভিক্ষা করা বৈধ। এ তিনজন ছাড়া যে ভিক্ষা করে খায় সে হারাম খায়।’ -সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৪৪; মুসনাদে আহমদ, হাদীস: ৬৫৩০

সুতরাং কারও ব্যাপারে যদি নিশ্চিত জানা যায় কিংবা প্রবল ধারণা হয় যে, সে এ ধরনের পেশাদার ভিক্ষুক তবে তাকে ভিক্ষা দেওয়া যাবে না।

কিন্তু পথেঘাটে চলার সময় এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুঝা মুশকিল। পাশাপাশি হাদীস শরীফে মুমিনের প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করতে বলা হয়েছে। তাই কারো অবস্থা জানা না গেলে তার বাহ্যিক অবস্থা দেখে যদি প্রবল ধারণা হয় যে, সে বাস্তবেই অভাবগ্রস্ত এবং অপারগতার কারণেই হাত পেতেছে তাহলে তাকে দান করতে অসুবিধা নেই। 

অনুরূপভাবে যে বাস্তবে প্রতিবন্ধী যেমন কারো দুটি হাত নেই বা পা নেই কিংবা পঙ্গু অথবা অন্ধ এদেরকেও তাদের বাহ্যিক অবস্থার প্রতি খেয়াল করে কিছু দিতে অসুবিধা নেই। 

তবে যাকাত, ফিতরা, ফিদয়া, কাফফারা ইত্যাদি যাচাই বাছাই করে দেওয়া উচিত। অর্থাৎ গ্রহীতা আসলেই এসব দান গ্রহণের উপযুক্ত কিনা তা একটু বুঝে শুনে দেওয়া উচিত। কারণ, যারা এসব আবশ্যিক দান গ্রহণ করার উপযুক্ত নয় তাদেরকে এগুলো দিলে তা আদায় হবে না।

-তাবয়ীনুল হাকায়েক ২/১২৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/১৬৩; ফাতহুল কাদীর ২/২১৪; আলবাহরুর রায়েক ২/২৪৭-৪৮; রদ্দুল মুহতার ২/৩৫২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৪/৪০৮; ফিকহী যাওয়াবেত ২/২২৮


উত্তর প্রদানে -
মুফতি মুহাম্মদ ইমদাদুল্লাহ হাফিজাহুল্লাহ
উস্তাযুল হাদীস ও মুশরিফ
ফতোয়া বিভাগ 
জামেআ হাকীমুল উম্মত
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

• جاء في الفتاوى الهندية ٤٠٨/٤ : ﺳﺌﻞ ﺑﻌﻀﻬﻢ ﻋﻦ اﻟﺘﺼﺪﻕ ﻋﻠﻰ اﻟﻤﻜﺪﻳﻦ اﻟﺬﻳﻦ ﻳﺴﺄﻟﻮﻥ اﻟﻨﺎﺱ ﺇﻟﺤﺎﻓﺎ ﻭﻳﺄﻛﻠﻮﻥ ﺇﺳﺮاﻓﺎ؟ ﻗﺎﻝ: ﻣﺎ ﻟﻢ ﻳﻈﻬﺮ ﻟﻚ ﺃﻥ ﻣﺎ ﺗﺘﺼﺪﻕ ﻋﻠﻴﻪ ﻳﻨﻔﻖ ﻓﻲ اﻟﻤﻌﺼﻴﺔ ﺃﻭ ﻫﻮ ﻏﻨﻲ ﻻ ﺑﺄﺱ ﺑﺎﻟﺘﺼﺪﻕ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﻫﻮ ﻣﺄﺟﻮﺭ ﺑﻤﺎ ﻧﻮﻯ ﻣﻦ ﺳﺪ ﺧﻠﺘﻪ ﻛﺬا ﻓﻲ اﻟﺤﺎﻭﻱ ﻟﻠﻔﺘﺎﻭﻯ.

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন