কৃষিকাজে বিজ্ঞান রচনা

কৃষিকাজে বিজ্ঞান রচনা - প্রবন্ধ - নিবন্ধ - bongotweet.com
ছবি: © yourequipmentsuppliers.com

কৃষি কাজে বিজ্ঞান

ভূমিকা : সভ্যতার উষালগ্নে মানুষ যেদিন মাটিতে বীজ বুনে ফল ও ফসল ফলাতে শুরু করল, সেদিন থেকেই ফসল ফলানাের কাজে লাঙল, কোদাল ইত্যাদি প্রাথমিক হাতিয়ার ব্যবহার করতে শুরু করল। সে ছিল আদিম ধরনের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি । তারপর কত শতাব্দী চলে গেছে। বিজ্ঞানের হয়েছে অভাবনীয় অগ্রগতি। এখন কৃষিতে লেগেছে আধুনিক বিজ্ঞানপ্রযুক্তির ছোঁয়া। বাংলাদেশের কৃষিতে বিজ্ঞানের প্রয়ােগ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ মানেই গ্রাম বাংলা, মাটি ও মানুষের বাংলা। এদেশের শতকরা ৮০ জন অধিবাসী কৃষিজীবী। গােটা বাংলাই যেন একটা কৃষিক্ষেত্র। বাংলাদেশ ও এর অধিবাসী সবই কৃষিনির্ভর। কৃষি আমাদের প্রাণ, কৃষি আমাদের ধ্যানজ্ঞান ও সাধনা। তাই এদেশের কৃষিতে বিজ্ঞানের প্রয়ােগ খুবই গুরুত্ব বহন করে। 

কৃষিকাজে বিজ্ঞান : একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বিশ্ববাসীর কোনাে কাজেই বিজ্ঞানের অনুপস্থিতি নেই। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা আজ সর্বত্র। বিজ্ঞানের কল্যাণে অন্ধকার পৃথিবী আজ আলােকিত। বিজ্ঞানের কল্যাণেই মরু হয়েছে সরস ও উর্বর, দুর্গম পাহাড়ের খাড়াই-উত্রাই পরিণত হয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত সমভূমিতে, নদী পেয়েছে নতুন গতি, শুকনাে খেতে চলছে জল-সেচ। জগৎ ও জীবনের কর্মপ্রবাহের প্রতিটি স্তরে বিজ্ঞান তার অবদানের স্বাক্ষর বহন করছে। কৃষিবিজ্ঞানীরা বর্তমান শতাব্দীতে কৃষিকাজে বিজ্ঞানের ব্যবহারকে সাফল্যজনক পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। অল্প জমিতে অধিকতর ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে নিবিড় চাষের জন্যে যান্ত্রিক সরঞ্জামের আবিষ্কার কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লবের সূচনা করেছে। ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের সঙ্গে আরও নানা ধরনের যান্ত্রিক সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির আবিষ্কার মানুষ ও পশুশ্রমকে মুক্তি দিয়েছে। একই সঙ্গে গােবর সার, কম্পােস্ট সার ও সবুজ সারের স্থলে রাসায়নিক সার; যথা- ইউরিয়া, টিএসপি ও এএসপি ইত্যাদির আবিষ্কারের ফলে একর প্রতি ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণের ওপরে চলে গেছে। পাশাপাশি উল্লেখ করা যায় ধান ও গমের ক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল বীজ আবিস্কারের কথা। ফিলিপাইনের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রে ইরি ধান আবিষ্কৃত হয়। এরপর বাংলাদেশের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ইরি-৮ নামক উচ্চ ফলনশীল ধান আবিষ্কার করে এদেশের কৃষিক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা আবশ্যক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নােবেল প্রাইজ বিজয়ী বিজ্ঞানী নর্মান বেরলগের মাক্সিপাক ও অন্যান্য জাতের উচ্চ ফলনশীল গম আবিষ্কার করে কৃষিকাজের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রয়ােগজনিত সাফল্য শুধু ধান ও গমের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানের এ সাফল্য দেশের প্রায় সকল ধরনের ফল, ফলারি ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেই সাধিত হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে পােকামাকড় দমন ও নির্মূল করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়ােগ ঘটেছে অন্য সকল ক্ষেত্রের মতােই। নানা ধরনের পােকার আক্রমণ থেকে শস্যকে রক্ষার জন্যে ইনসেকটিসাইড বা পােকা দমনকারী বহু রাসায়নিক দ্রব্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে এড্রিন, ডায়াজিন, ক্লোর ছাড়াও রয়েছে অনেক পােকা-ধ্বংসী ওষুধ।

বাংলাদেশের কৃষিতে বিরাজমান অবস্থা : অধিক জনসংখ্যার ভারে বাংলাদেশ আজ নুয়ে পড়েছে। জনসংখ্যার গুরুভার সৃষ্টি করেছে প্রকট খাদ্য সমস্যা। আমাদের দেশের প্রচলিত প্রাচীন চাষাবাদ পদ্ধতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সমতা বজায় রেখে কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপাদন করতে পারছে না। আমাদের মাটির তুলনায় জাপানের মাটির স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা এক চতুর্থাংশ। অথচ তারা কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের চেয়ে প্রায় অর্ধেক জমিতে সর্বাধিক ফসল ফলিয়ে খাদ্য সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে। শুধু তাই নয়, বাড়তি খাদ্য রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। অথচ আমাদের দেশের কৃষিক্ষেত্রে উল্লেখযােগ্য কোনাে অগ্রগতি নেই। ফসলি জমির পরিমাণ দিনদিন কমে যাচ্ছে। কৃষিকাজে উৎসাহ হারিয়ে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। 

আমাদের কৃষি ও আধুনিক প্রযুক্তি : আমাদের দেশে ট্রাক্টরের মতাে আধুনিক কৃষিজ উপকরণের ব্যবস্থা থাকলেও এখনও চোখে পড়ে লাঙ্গল-গরু নিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদের ঘটনা। অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখনও সঠিকভাবে শুরু হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়ােগে নানা অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে বিপুল গবেষণার ফলস্বরূপ দেশী পাটের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মােচনে সক্ষম হয়েছেন আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা। এর মাধ্যমে আমাদের সােনালি আঁশের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার সুযােগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া কৃষিবিদদের নিরলস প্রচেষ্টায় নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত আবিস্কৃত হচ্ছে। কৃষি সম্পর্কিত পণ্যের আমদানি, বাজারজাতকরণ ইত্যাদিতে গতি বৃদ্ধি পেয়েছে, বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় রেডিও, টেলিভিশন, মােবাইল ফোন ইত্যাদির মাধ্যমে ঘরে বসেই কৃষকরা পেয়ে যাচ্ছেন কৃষি সম্পর্কিত নানা জিজ্ঞাসার জবাব ও প্রয়ােজনীয় নির্দেশনা। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতা, অশিক্ষা এবং এর ব্যয়বহুলতার কারণে কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যবহার এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌছাতে পারেনি। আমাদের কৃষিকাজে নিয়ােজিত অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত। ফলে এ ব্যাপারে তাদের এখনাে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। 

আমাদের করণীয় : কৃষিখাতের উন্নয়নেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি নিহিত। তাই কৃষিখাতকে সুদৃঢ় করতে এ খাতে বিজ্ঞানের যথাযােগ্য ব্যবহার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কৃষিতে বিজ্ঞানের ব্যবহার বাড়াতে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। অতি শীঘ্র অনলাইন কৃষি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য, যেমন আধুনিক পদ্ধতির বর্ণনা, নতুন উপকরণ তৈরির ব্যাপারে সচিত্র সহায়িকা, বিশ্ববাজারে কৃষিপণ্যের বর্তমান অবস্থা, প্রক্রিয়াকরণের জন্য উপদেশগুলাে সন্নিবেশিত করতে হবে। আর এ প্রক্রিয়াটি যথাসম্ভব সহজবােধ্য করে তুলতে হবে। এ সকল সুবিধাদি পাওয়ার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আধুনিক ব্যবস্থাগুলাে যাতে সুলভ মূল্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরা পেতে পারে সে ব্যবস্থা করা দরকার। কৃষিতে বিজ্ঞানের উত্তরােত্তর ব্যবহার বাড়ানাের লক্ষ্যে প্রয়ােজন উপযুক্ত গবেষণার সুবিধা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। মােট কথা কৃষির প্রতি প্রান্তিক মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিজ্ঞানের প্রয়ােগের আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। 

উপসংহার : আমাদের জাতীয় উন্নয়ন সম্পূর্ণভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমেই কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে আমরা পরনির্ভরশীলতার অভিশাপ থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি।

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন