জানবাজ কুকুর - শিক্ষনীয় গল্প

জানবাজ কুকুর - শিক্ষনীয় গল্প - বঙ্গ টুইট - Bongo Tweet

একজন লােক সুলতানের সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরছিল। সঙ্গে ছিল তার আর্মেনীয় নতুন কর্মচারী। পথিমধ্যে একটি গােরস্থান অতিক্রম করার সময় তারা একটা সবুজ গম্বুজবিশিষ্ট কবর দেখতে পেল। তাতে লেখা—এটি একটি বিশেষ কুকুরের কবর। কেউ যদি তার সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়, তবে সে যেন অমুক গ্রামে যায়। সেখানে নিশ্চয় এমন কাউকে পাওয়া যাবে, যার থেকে কুকুর বিষয়ে সম্পূর্ণ ঘটনাটি জানা যাবে।

আর্মেনীয় লােকটির ভেতর কৌতূহল জেগে উঠল। সে তখনই গ্রামটির সন্ধান নিয়ে রওনা দিল। এর-ওর কাছে শুনতে শুনতে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটিকে পেয়ে গেল। 

আর্মেনীয় লােকটি কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছে গিয়ে বুঝলেন, লােকটির অনেক বয়স হয়েছে। চুল-দাড়ি সব পেকে কাশফুল হয়ে গেছে। চামড়া গুছিয়ে চিরচিরে হয়ে গেছে। বৃদ্ধের কাছে নিজের আগমনের উদ্দেশ্যের কথা বললেন। 

বৃদ্ধ প্রথমে একটু ভাবলেন। মুখটি সামান্য আকাশের দিকে উঠালেন। তারপর এক দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বললেন, তাই তাে বাছা, দুনিয়ার ঘটনা বােঝা বড় সহজ নয়। মানুষের তবু লজ্জা হয় না। দয়া করে আমাকে ঘটনাটা একটু বলুন, চাচা। শােন তাহলে, 

সে অনেকদিন আগের কথা। আমার বয়স তখন অল্প। এ এলাকায় একজন নামকরা রাজা ছিলেন। ভ্রমণ, শিকার, আনন্দ-প্রমােদ ছিল তার কাছে অতি প্রিয়। তার একটি সুন্দর কুকুর ছিল। কুকুরটিও ছিল অত্যন্ত প্রভুভক্ত। রাজা যেখানে যেতেন কুকুরও তার সঙ্গে সঙ্গে যেত। রাজা একবার এক শিকারে বের হলেন। বনের পাশে এক জায়গায় তাঁবু খাটানাে হলাে। সঙ্গে রয়েছে অনেক লােকজন। দাস-দাসী। সৈন্য-সামন্ত। যথারীতি কুকুরটিও আছে। রাজা ভৃত্যকে বললেন, 'বাবুর্চিদের বলো আজ দুধ দিয়ে যেন পায়েস বানায়।' 

এ কথা বলে রাজা শিকার করতে বেরিয়ে গেলেন। বাবুর্চিরা রাজার কথামতাে সুন্দর সুস্বাদু পায়েস তৈরি করল। রাজা তখনাে আসেনি। পায়েস রান্না শেষ। বাবুর্চিরা অন্য আরও রকমের খাদ্য তৈরি করতে শুরু করল। এদিকে পায়েসের গামলা পড়ে আছে আলগা। ঢাকার কথা কারও মনে নেই। কিছুক্ষণ পর একটা বিষাক্ত সাপ এসে পায়েসের গামলায় মুখ দিল। কিছুটা দুধ খেয়ে গামলাতে বিষ ঢেলে চলে গেল। সবার অলক্ষে। জমিনের কেউ দেখল না। দেখল শুধু কুকুর আর অসুস্থ প্রতিবন্ধী বােবা ছােট এক মেয়ে। কুকুর যদি তখনই কোনােভাবে সাপকে বাধা প্রদান করার ক্ষমতা রাখত তবে সে তা-ই করত। কিন্তু সে ক্ষমতা তার নেই।

রাজা শিকার শেষে বিকেলের দিকে ফিরে এলেন। গােলামদের বললেন, ক্ষুধা লেগেছে। দস্তরখানা লাগাও। পায়েস আনাে। পায়েস নিয়ে আসা হলাে। রাজা খাওয়ার আয়ােজন শুরু করলেন । হাত- মুখ ধৌত করলেন। এরপর বসে গেলেন দস্তরখানায়। এ সময় বােবা মেয়েটি তাদের দিকে ইশারা করে কিছু বলতে চাইল। হাত নেড়েও কিছু বােঝাতে চাইল। কিন্তু তারা কেউ তার ইঙ্গিত-ইশারার অর্থ বুঝতে পারল না। 

আরও পড়ুন : প্রকৃত আপনজন - শিক্ষামূলক গল্প

এদিকে কুকুরও শুরু করেছে অকারণে ঘেউ ঘেউ। কিছু যেন বলতে চায়। কী যেন একটা ঘটেছে। বারবার পায়েসের গামলার দিকে তাকাচ্ছে আর ঘেউ ঘেউ করছে। রাজা খাওয়া রেখে সেদিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু তিনিও কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। এদিকে তার ক্ষুধাও লেগেছে প্রচুর। কুকুরের দিকে আর মনােযােগ না দিয়ে খাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কুকুর এবার আরও চিৎকার শুরু করল। তীব্রস্বরে। আর্তস্বরে। তারস্বরে। কুকুর যেন পাগল হয়ে গেছে। রাজা মনে করলেন, তিনি ছিলেন না, সে তার কারণে হয়তাে কুকুরের ঠিকমতাে খাওয়া হয়নি। প্রতিদিন যা খেতে দেন, তার চেয়েও ভালাে খাবার কুকুরের সামনে দিতে নির্দেশ দিলেন। খাবার দেয়া হলাে। কুকুর সেদিকে মুখ করেও তাকাল না। রাজার আরও কাছে এসে তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করতেই লাগল। (হায়! মানুষের কর্ণে তার ভাষা শুধুই ঘেউ ঘেউ) রাজা এবার রেগে গেলেন। মহা বিরক্ত হলেন। গােলামদের বললেন, আমার সামনে থেকে পাজি কুকুরটাকে হটাও। নিশ্চয় ওর আজ ভূতে পেয়েছে। এ কথা বলে রাজা দস্তরখানায় বসে খাওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন।

ঠিক তখন চোখের পলকে কুকুরটা দস্তরখানার উপর লাফিয়ে পড়ে গামলায় মুখ দিল। রাজা রাগে ক্ষোভে একেবারে অস্থির হয়ে উঠলেন। কুকুরটি এ কি করল। তার শখের খাবার একেবারে নষ্ট করে দিল! কুকুর হয়ে পায়েস খাওয়ার ইচ্ছা জেগেছে!!

রাজা ক্ষীপ্ত হয়ে উঠলেন। কিন্তু কুকুরটি এক দৃষ্টিতে রাজার দিকে তাকিয়েই রয়েছে। চোখে তার করুণ চাহনি । কিসের যেন আকুতি। শেষ বারের জন্য কি দেখে নিচ্ছে নিজের মুনিবকে! 

ক্ষণিকের মধ্যেই কুকুরটির মুখ দিয়ে গ্যাজা উঠতে শুরু করল। ছটফট করতে করতে মাটিতে ঢলে পড়ল। এবং মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে চোখের সামনে তড়পাতে তড়পাতে কুকুরটি মৃত্যুবরণ করল । বিষের তিব্রতায় তর গােশত ফেটে ফেটে খসে খসে পড়তে লাগল । 

রাজা হতভম্বের মতাে নিথর দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুই যেন তার মাথায় ঢুকছে না! এসব কী হচ্ছে—কী ঘটছে!! হুঁশ ফিরতেই তিনি বুঝতে পারে, কী ভয়াবহ মৃত্যু তার জন্য অপেক্ষা করছিল। এবার বােবা মেয়েটির ইশারা ও কুকুরের চিৎকারের অর্থ বুঝতে পারলেন। সেই সঙ্গে প্রিয় কুকুরটির মৃত্যুতে ব্যথায় তার হৃদয় চৌচির হতে লাগল। দু-চোখ ভরে ঝরঝর করে ঝরতে লাগল অবাধ্য অশ্রুফোটা । তাকে বাঁচাতে গিয়ে কুকুরটি এভাবে প্রাণটা পর্যন্ত দিয়ে দিল! 

অশ্রু প্রকোপ কিছুটা কমলে তিনি আশপাশের গােলাম-কর্মচারীদের বললেন, আমার জন্য যে নিজের প্রাণটা দিয়ে দিল তাকে আমি মানুষের কবরস্থানে দাফন করব। আমি নিজ হাতে তাকে বয়ে নিয়ে যাব। নিজেই দাফন করব। 

রাজা নিজহাতে মৃত কুকুরটিকে মানুষের মতাে কাফন-দাফন দিলেন। কবরের উপর একটি উঁচু গম্বুজ তৈরি করলেন। কবরের উপর যে লেখাটি আপনি দেখেছেন, সেটি রাজা নিজেই লিখে গিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন