একজন সতী নারী - ইসলামিক শিক্ষামূলক গল্প

একজন সতী নারী - ইসলামিক শিক্ষামূলক গল্প - ইসলামিক গল্প - বঙ্গ টুইট - Bongo Tweet

বনি ইসরাইলের একজন ব্যবসায়ী হজ্বে যাওয়ার সময় তার স্ত্রীকে ছােট ভাইয়ের ঘরে রেখে যায়। ছােট ভাই ক'দিন পর (তার ভাবী) মহিলাকে তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়। মহিলা তার প্রস্তাবে অসম্মতি জানায়। সে অনেক অনুনয় ও জবরদস্তী করেও ঐ মহিলাকে অপকর্মে রাজী করাতে পারেনি। এদিকে শয়তানও সবসময় ছােট ভাইকে কুমন্ত্রণা দিয়েই যাচ্ছে। একদিন শয়তান মানুষ বেশে সে লােকটির কাছে এসে তাকে এভাবে প্ররােচিত করে যে, যদি মহিলা তার মনের চাহিদা মেটাতে রাজি না হয় তবে তার উপর যিনার অপবাদ আরােপ করবে এবং প্রস্তরাঘাত করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার হুমকি প্রদান করবে।

শয়তানের প্ররােচনায় সে পুনরায় মহিলার নিকট কুকর্মের প্রস্তাব দেয়। এবং তার প্রস্তাবে রাজি না হলে তার পরিণতি যে ভয়াবহ হবে, সে কথাও তাকে জানিয়ে দেয়। কিন্তু তাতেও মহিলা রাজী হলাে না। সুতরাং পাষণ্ড লােকটি মহিলার উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরােপ করে এবং পাথর মেরে হত্যা করার জন্য লােকদের নির্দেশ দেয়। লােকেরা মহিলাকে নিয়ে দূরে এক জঙ্গলে গিয়ে প্রস্তরাঘাত করে এবং মহিলার মৃত্যু নিশ্চিত মনে করে জঙ্গলের এক পাশে ফেলে চলে আসে।

কিছুক্ষণ পর একজন পথিক জঙ্গলের পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিল। সে জঙ্গল থেকে মানুষের কান্নার শব্দ শোনে নিকটে গিয়ে একজন মহিলার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখে শিহরােতি হয়ে উঠে। তখন সে হাত ও পায়ের বন্ধন খুলে দিয়ে মহিলাটিকে তার গৃহে নিয়ে আসে। ঐ রাতে লােকটির ঘরে একজন মেহমানের আগমন হয়। মেহমান ঐ বিপদগ্রস্থ সুন্দরি মহিলাকে দেখামাত্রই তার উপর আসক্ত হয়ে পড়ে। রাতে বিপদগ্রস্থ সুন্দরি মহিলার পাশ্বে বাড়ীওয়ালার এক সুন্দরী যুবতী মেয়ে তাঁর সাথে ঘুমায়। এদিকে রাত যখন গভীর হয় এবং আশে পাশের লোকেরা গভীর নিদ্রায় বিভাের তখন লােলুপ্যমনা চরিত্রহীন মেহমান বিপদগ্রস্ত মহিলার ঘরে প্রবেশ করে তাকে চরিতার্থ করার জন্য ভুলক্রমে ঐ মহিলার পরিবর্তে গৃহস্বামীর যুবতী কন্যার উপর অপকামের জন্যে চড়াও হয়। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও যখন তাকে কুকর্মে রাজি করাতে পারেনি, তখন উভয়ের মধ্যে দস্তাদস্তির এক পর্যায়ে মেহমান কন্যাটিকে চিনতে পারে। তখন সে গৃহস্বামীর যুবতী কন্যাকে হত্যা করে প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে পালিয়ে গেল। গৃহস্বামী তার কন্যাকে মৃত অবস্থায় দেখে সে এবং তার স্ত্রী মনে করল যে, এ জঘন্যতম হত্যাকান্ডটি বিপদগ্রস্থ মহিলাটিই ঘটিয়েছে। বিবেকের অবচেতনায় প্রলুব্ধ হয়ে গৃহস্বামী ও তার স্ত্রী বিপদগ্রস্থ মহিলার উপর ক্রোধান্বিত হয়ে মহিলাটিকে মারপিট করে গৃহ থেকে বের করে দেয়। মহিলাটি ঘর থেকে বের হয়ে এক অজানা পথের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।

সে বিষন্ন মনে হাঁটছিল আর নিজের অসহায়ত্বের কথা ভেবে মনে মনে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছিল। কিছু পথ অতিক্রম করার পর হঠাৎ সে দেখলাে যে, জনৈক ব্যক্তি ঋণের টাকা পরিশােধ করতে অপরাগ হওয়ায় মালিক তাকে গুলিবিদ্ধ করতে প্রস্তুত। মহিলা লােকটির অসহায়ত্ব দেখে ঋণের টাকা শােধ করে তাকে মালিক থেকে মুক্ত করে দেয়। এতে লােকটি মহিলার নিকট অতিশয় কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে এবং তার বিনিময় হিসেবে সে
মহিলার নিকট গােলাম হয়ে থাকার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। মহিলাও তাতে রাজী হল।

অত:পর মহিলা লােকটিকে সাথে নিয়ে চলল। পথিমধ্যে সমুদ্র পথে যাবার সময় জাহাজের একটি কক্ষে উভয়ই অবস্থান করে। হঠাৎ লােকটি কক্ষের মধ্যে মহিলার লাবন্যময় চেহারা দেখে ফেলে। অপরূপ চেহারা দেখে গােলাম মহিলার উপর আসক্ত হয়ে পড়ে এবং মহিলাকে কুকর্মে লিপ্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু মহিলা কিছুতেই তার প্রস্তাবে রাজি হয়নি। ঐ জাহাজে পাশের একটি কক্ষে অপর একজন বণিক সফরের উদ্দশ্যে যাচ্ছিল। গােলাম মহিলাকে রাজি করাতে না পেরে ক্ষোভে জ্বলে উঠে এবং চক্রান্ত করে লােকটিকে বলে যে, তার নিকট একজন অতুলনিয় সুন্দরী দাসী আছে। সে ঐ দাসীকে বিক্রি করবে। বণিক লোকটি মহিলার রূপ লাবন্য দেখামাত্রই তার উপর আসক্ত হয়ে তাকে খরিদ করে নেয়। এবং তার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার জন্য মহিলাকে বাধ্য করতে চেষ্টা করে। মহিলা অনেক অনুনয় বিনয় করে বলে যে সে দাসি নয়। বরং সে লােকটি তাকে বাঁদী বলে বিক্রি করেছে সেই আমার কৃতদাস। আমি তাঁর ঋণের পয়সা শােধ করে তাকে গুলির সাজা থেকে মুক্ত করে এ পর্যন্ত এনেছি।

লােকটি মহিলার কথায় কর্ণপাত না করে নিজের আকাঙ্খা পূর্ণ করার জন্য মহিলার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এমন সময় সমুদ্র থেকে হঠাৎ ঘুর্নিঝড় উঠে এবং জাহাজ সমুদ্রে ডুবে যায়। ঘটনাক্রমে মহিলাটি একটি কাঠের উপর বসে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হল এবং সম্পূর্ণ সুস্থাবস্থায় সমুদ্রের পাড়ে অন্য একটি শহরে গিয়ে উঠল। এ দুর্ঘটনায় বহু লােক মারা যায়, কিন্তু জাহাজের ঐ বণিক লােকটি ও বেঁচে রইল।

মহিলা শহরে গিয়ে জানতে পারে যে, ঐ দেশের রাজা অত্যন্ত সৎলােক ও খােদাভীরু। মহিলা তখন রাজার নিকট উপস্থিত হয়ে তার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সকল বিপদের কথা বর্ণনা করলাে, বাদশাহ মহিলার কথাগুলাে মনােযােগ সহকারে শুনেন এবং তাকে অতিশয় নেককার মনে করে শহরের উপকণ্ঠে তার ইবাদতের জন্য আলাদা একটি ঘর তৈরী করে দেন। মহিলা ঐ গৃহে অতি নির্জনে কায়মনােবাক্যে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে নিয়ােজিত রইলেন।

কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর মহিলার দরবেশীর কথা দেশ ব্যাপি ছড়িয়ে পড়ল। লােকেরা দু:খ দুর্দশায় এবং রোগে তার নিকট দোয়া চাওয়ার জন্য আসতে লাগল। যে কেউ তার নিকট দোয়া চাইত সেই সফলকাম হত। এদিকে মহিলার স্বামী হজ্বব্রত পালন করে দেশে ফিরল। কিন্তু ঘরে তার স্ত্রীকে না পেয়ে ছােট ভাইকে জিজ্ঞাসা করল। ভাই উত্তরে বলল, তুমি হজ্জে চলে যাওয়ার পর তােমার স্ত্রী ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিল। সুতরাং যিনার অপরাধে তাকে দন্ডিত করে পাথর মেরে হত্যা করা হয়েছে। তার সাথে মহল্লার একদল লােক ও সাক্ষ্য দিল। হাজী সাহেব ভাইয়ের উত্তরে শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চুপ করে রইলাে।

কিছুদিন পর হাজী সাহেবের ভাইয়ের চোখ দু'টি অন্ধ হয়ে যায়। যারা সাক্ষ্য দেয় তারাও দৃষ্টিহীন হয়ে গেল। এ দিকে হাজী সাহেব পার্শ্ববর্তী দেশে জনৈক মহিলার দরবেশী ও দোয়া কবুল হওয়ার সংবাদ জানতে পারে। সুতরাং কাল বিলম্ব না করে তার ভাইকেসহ সকল অন্ধ লোকদের সাথে নিয়ে ঐ দরবেশ মহিলার নিকট যাওয়ার জন্য যাত্রা করে । পথে যে লােকটি গৃহস্বামীর যুবতী কন্যাকে ঐ সুন্দরী মহিলা মনে করে রাতের অন্ধকারে হত্যা করেছিল তার সাথে দেখা হয়। সে অধহ রােগে মুমূর্ষ অবস্থায় ছিলাে। সেও দোয়া নেয়ার জন্য যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুতরাং হাজী সাহেব সাথে তাকে নিয়ে নেয়। আর কিছু দূর যাওয়ার পর দেখা গেল যে, লােকটিকে ঋণ শােধ করে মৃত্যুর হাত হতে বাঁচিয়ে ছিল, সে ক্ষয় রােগ বা ক্যান্সার রােগে ভুগছে। সেও মহিলার নিকট রােগ মুক্তির জন্য যাওয়ার অপেক্ষা করছিল। হাজী সাহেব তাকেও সাথে নিল। সমুদ্র পার হয়ে হাজী সাহেবের সাথে একজন পঙ্গু লােকের সাক্ষাৎ হলাে, সেও দোয়ার জন্য মহিলার নিকট যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছি। হাজী সাহেব তাকেও সাথে নিয়ে গন্তব্যে পৌছে গেলেন।

মহিলা সেই রােগাক্রান্ত লােকদেরকে দেখে চেনে ফেললাে এবং বললাে, যদি তােমরা নিজ নিজ অপরাধের কথা আমার সামনে স্বীকার কর তবে তােমাদের রােগ মুক্তির জন্য দোয়া করবাে, নতুবা দোয়া করবাে না। মহিলার এ প্রস্তাবে তারা অসম্মতি জানায়। কিন্তু মহিলাও দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেয় যে যতক্ষণ তারা অপরাধ স্বীকার না করবে, ততক্ষণ দোয়াও করা হবে না। কাজেই তারা নিরুপায় হয়ে জনৈক মহিলার সাথে কৃত অপরাধের কথা স্বীকার করল। এদিকে মহিলা তার স্বামী হাজী সাহেবকেও দেখামাত্রই চিনতে পারলাে। সুতরাং সে পর্দার আড়াল থেকে বের হয়ে তার স্বামীর সাথে সাক্ষাত করলাে, এবং তার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সকল লােহমর্ষক ঘটনাগুলাে একের পর এক বর্ণনা করল। সাথে সাথে একথাও জানিয়ে দিল যে, ঐ রােগক্রান্ত লােকেরাই তার শ্লীতাহানীর অপচেষ্টা করেছিল। যাহােক, মহিলা লােকদেরকে বললাে, তােমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কৃত অপরাধের জন্য তাওবা কর এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাও। আল্লাহ তােমাদের হয়তো ক্ষমা করে দিবেন। আর আমার পক্ষ থেকে তােমাদেরকে মাফ করে দিলাম। এ কথা বলে মহিলা তাদের জন্য দোয়া করলেন। তারা রােগ থেকে মুক্তি পেল এবং অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে মহিলার নিকট ক্ষমা চাইলাে। মহিলাও তাদের ক্ষমা করে দিলেন।

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন