ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) এর জীবনী

ইমাম মালিক (রহ.) এর পরিচয়

নাম : ইমাম মালিক (রহ.)-এর প্রকৃত নাম হচ্ছে মালিক বিন আনাস (র)। তাঁর কুনিয়াত বা উপনাম আবু আব্দুল্লাহ। তবে তিনি মূল নামেই বিশ্ববিখ্যাত হন। বংশনামা : মালিক বিন আনাস বিন আবূ আমির বিন আমর বিন হারিস আল-আসবাহী। তিনি আরবের প্রসিদ্ধ গােত্র কাহ্ত্বান এর উপগােত্র আসবাহ্ অন্তর্ভূক্ত, এজন্য ইমাম মালিক (রহ.) ‘আল-আসবাহী’ বলে পরিচিত। 

ইমাম মালিক (রহ.) এর জন্ম ও প্রতিপালন

ইমাম মালিক ইবনে আনাস (র) এর পূর্বপুরুষ ছিলেন ইয়েমেন এর অধিবাসী। ইমাম মালিক (র) এর দাদা আবু আমের। তিনি হিজরী দ্বিতীয় সনে (৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইসলাম গ্রহণ করে এবং মদিনায় চলে আসেন সপরিবারে। পরবর্তীতে ইমাম মালিক (রহ.) পবিত্র মদীনা নগরীতে এই সম্ভ্রান্ত শিক্ষানুরাগী মুসলিম পরিবারে জন্মলাভ করেন। জন্মের সন নিয়ে কিছু মতামত থাকায় ইমাম যাহাবী (রহ.) বলেন: বিশুদ্ধ মতে ইমাম মালিক (রহ.) এর জন্ম সাল হচ্ছে ৯৩ হিজরী সালে। যে সালে রাসূলুল্লাহ (সা) এর খাদেম হযরত আনাস বিন মালিক (রহ.) মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

ইমাম মালিক (রা) তার পিতা আনাস বিন মালিকের কাছে মদীনায় প্রতিপালিত হন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন তাবে তাবেঈ ও হাদীস বর্ণনাকারী। তার কাছ থেকে ইমাম যুহুরীসহ অনেকেই হাদীস বর্ণনা করেন। ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) ও তার পিতার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। ইমাম মালিক (রা) এর দাদা আবু আনাস মালিক (রহ.) একজন প্রসিদ্ধ তাবেঈ ছিলেন। তিনি ওমার, আয়িশা ও আবু হুরায়রা (রা) থেকে অনেক হাদীস বর্ণনা করেন। তাঁর পিতামহ আমির বিন আমর (রা) একজন প্রসিদ্ধ সাহাবী ছিলেন। এই সম্ভ্রান্ত দ্বীনী পরিবেশে জ্ঞানপিপাসা নিয়েই বিখ্যাত ইমাম মালিক (রা) প্রতিপালিত হন। 

ইমাম মালিক (রহ.) এর শিক্ষা জীবন

রাসূল (সা) এর হিজরতের পর হতে আজও পর্যন্ত দ্বীনী জ্ঞান চর্চার প্রাণকেন্দ্র হলাে পবিত্র মদীনা। সে মদীনাতে জন্মলাভ করার অর্থ হল দ্বীনী জ্ঞান চর্চার প্রাণকেন্দ্রেই জন্ম লাভ করা। বিশেষ করে বংশীয় দিক দিয়ে ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) এর পরিবার দ্বীনী জ্ঞানচর্চায় ছিল খুবই অগ্রগামী। এজন্য তিনি শৈশবকাল হতেই শিক্ষা শুরু করেন। 

কৈশােরে তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আবদুর রহমান বিন হরমুষ, ইমাম যতুরী, নাফে ইবন যাকওয়ান, ইয়াহইয়া বিন সাঈদ প্রমুখের কাছে হাদিস শিক্ষালাভ করেন। যৌবনের প্রারম্ভে মক্কায় রবিয়াতুর রায়ের কাছে ইমাম মালিক ফিকহ অধ্যয়ন করেন। এক্ষেত্রে খুব কম সময়েই তিনি বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করেন। যার জন্য তিনি প্রথম যৌবনেই ফতােয়া দান ও রিওয়াতের অনুমতি লাভ করেন ।

ইমাম মালিক (রহ.) এর শিক্ষক বৃন্দ

ইমাম মালিক (রহ.) অসংখ্য বিদ্যান এর কাছ থেকে শিক্ষালাভ করেন। এ সম্পর্কে ইমাম যুরকানী (রহ.) বলেন - "ইমাম মালিক (রহ.) নয়শত এর অধিক শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করেন। বিশেষ করে ইমাম মালিক স্বীয় মুয়াত্ত্বা গ্রন্থে যে সব শিক্ষক এর কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাদেরই সংখ্যা হচ্ছে ১৩৫ জন, যাদের নাম ইমাম যাহাবী সিয়ার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযােগ্য কয়েকজন নিম্নরূপ: 

১. ইমাম রাবীয়া ইবনে আবূ আবদুর রহমান (রহ.)
২. ইমাম মুহাম্মদ বিন মুসলিম আযযুহুরী (রহ.)
৩. ইমাম নাফি মাওলা ইবনু ওমার (রহ.)
৪. ইবরাহীম বিন উবাহ (রহ.)
৫. ইসমাঈল বিন মুহাম্মদ বিন সা'দ (রহ.)
৬. হুমাইদ বিন কায়স আল ‘আরজ (রহ.)
৭. আইয়ুব বিন আবী তামীমাহ আস্সাখতিয়ানী (রহ.)

ইমাম মালিক (রহ.) এর কর্ম জীবন

হাদিস ও ফিকহশাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানার্জন করে ইমাম মালিক (র) মদিনার মসজিদে নববিতে বসেই শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে দারস ও ফতােয়া দিতেন। মিশর, আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লােকজন তার কাছে হাদিস ও ফিকহের জ্ঞান লাভের জন্য আগমন করত। আব্দুল্লাহ বিন মুবারক, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইমাম শাফেয়ি প্রমুখ বরেণ্য ব্যক্তিগণ তাঁর কাছে ফিকহ ও হাদিসের শিক্ষা গ্রহণ করেন। মদিনাবাসী হওয়ার সুবাদে গােড়া থেকেই তিনি হাদিস সংগ্রহ শুরু করেন। এরপর সংগৃহীত বিপুল হাদিস থেকে যাচাই-বাছাই করে মাত্র ১৭২০ খানা হাদিসের সমন্বয়ে ইমাম মালিক (র) মুসলিম আইনের হাদিসভিত্তিক সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ "মুয়াত্তা' প্রণয়ন করেন। এছাড়াও কিতাবুল মাজালিসাত, কিতাবুল মানাসিক, কিতাবুস সুনান তাঁর উল্লেখযােগ্য গ্রন্থ। "ফিকহি মালিকি' তার উদ্ভাবিত মাসয়ালাসমূহের বিশেষ সংকলন। 

আরও পড়ুনঃ

ফিকহ-শাস্ত্রের অগাধ জ্ঞানী ও পন্ডিত এই মহান ব্যক্তিকে ফিকহ মাসয়ালা জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে তার উত্তর দিয়ে দিতেন। কিন্তু হাদিসে নববির প্রতি তার এত বেশি শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল যে, যেকোনাে হাদিস জিজ্ঞেস করলে প্রথমে তিনি গােসল করে উত্তম পােশাক পরিধান করে গায়ে আতর ব্যবহার করতেন। তারপর উচ্চ উঁচু আসনে বসে হাদিস বর্ণনা করতেন।

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি ইমাম মালিক (র) সীমাহীন ভালােবাসা পােষণ করতেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হিজায (মক্কা-মদিনা) বাইরে যাননি বলে তিনিও কোনােদিন এর বাইরে যান নি। কেবল রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার জন্যই তিনি মদিনাবাসীদেরকে তার মাসয়ালা উদ্ভাবন প্রক্রিয়ায় বিশেষ স্থান দিয়েছেন। 

ইমাম মালিক (রহ.) সম্পর্কে আলিম সমাজের প্রশংসা

১. ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন - 'আলিম সমাজের আলােচনা হলে ইমাম মালিক তাদের মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্র, কেউ ইমাম মালিকের স্মৃতিশক্তি, দৃঢ়তা, সংরক্ষণশীলতা ও জ্ঞানের গভীরতার সমপর্যায় নয়। আর যে ব্যক্তি সহীহ (বিশুদ্ধ) হাদীস চায় সে যেন ইমাম মালিকের কাছে যায়।'

২. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন - 'বিদ্যানদের অন্যতম একজন ইমাম হচ্ছে ইমাম মালিক, তিনি হাদীস এবং ফিকাহ শাস্ত্রে একজন অন্যতম ইমাম, জ্ঞান-বুদ্ধি ও আদব আখলাকসহ হাদীসের প্রকৃত অনুসারী ইমাম মালিকের মত আর কে আছে?'

৩. ইমাম নাসাঈ (রহ.) বলেন - 'তাবেঈদের পরে আমার কাছে ইমাম মালিক এর চেয়ে অধিক বিচক্ষণ লোক আর কেউ নেই এবং হাদীসের ক্ষেত্রে তার চেয়ে অধিক আমানতদার ব্যক্তি আমার কাছে আর কেউ নেই।'

ইমাম মালিক (রহ.) এর ছাত্র বৃন্দ

ইমাম মালিক (রহ.) হলেন ইমামু দারিল হিজরাহ, অর্থাৎ মদীনার ইমাম। অতএব মদীনার ইমামের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য কে না চায়। তাই তাঁর ছাত্র অগণিত। ইমাম যাহাবী উল্লেখযােগ্য ১৬৬ জন ছাত্রের নাম উল্লেখ করেছেন। ইমাম খাতীব বাগদাদী ৯৯৩ জন ছাত্রের নাম বর্ণনা করেন। ইমাম মালিক (রহ.) এর প্রসিদ্ধ কয়েকজন ছাত্রের নাম নিচে দেওয়া হল -

১. ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস আশশাফেঈ (রহ.)
২. ইমাম সুফাইয়ান বিন উয়ায়নাহ (রহ.)
৩. ইমাম আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রহ.)
৪. ইমাম আবু দাউদ আত্তায়ালিসী (রহ.)
৫. হাম্মাদ বিন যায়দ (রহ.)
৬. ইসমাঈল বিন জাফর (রহ.)
৭. ইবনু আবী আযযিনাদ (রহ.) ইত্যাদি। 

ইমাম মালিক (রহ.) এর গ্রন্থাবলী

ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) এর বেশ কিছু রচনাবলী রয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযােগ্য কিছু গ্রন্থ নিচে উল্লেখ করা হল -

১. আল মুয়াত্ত্বা। হাদীসের জগতে কিছু ছােট ছােট সংকলন শুরু হলেও ইমাম মালিকের মুয়াত্ত্বা' সর্ব প্রথম হাদীসের উল্লেখযােগ্য ও নির্ভরযােগ্য সংকলন। এ গ্রন্থে ইমাম মালিক (রহ.) রাসূল (সা) -এর হাদীস, সাহাবী ও তাবেঈদের হাদীস এবং মদীনাবাসীর ইজমা সহ অনেক ফিকহী মাসআলা বিশুদ্ধ সনদের আলােকে সংকলন করেন। তিনি দীর্ঘদিন সাধনার পর, কেউ বলেন চল্লিশ বৎসর সাধনার পর এ মূল্যবান গ্রন্থ সংকলন করেন। সে সময় বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে হাদীসের গ্রন্থ 'মুয়াত্ত্বা' খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন - "কিতাবুল্লাহ তথা কুরআন এর পরই সর্ব বিশুদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে ইমাম মালিকের মুয়াত্ত্বা গ্রন্থ।" সহীহ আল বুখারীর সংকলনের পূর্বে মুয়াত্ত্বা-ই ছিল সর্ব বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ।  কিন্তু এখন সহীহ আল বুখারী-ই হচ্ছে সর্ববিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ। ২. কিতাবুল মানাসিক, ৩. রিসালাতুন ফিল কার ওয়াররাদ আলাল কাদারিয়া, ৪. কিতাব ফিন্নজুমি ওয়া হিসাবি মাদারিমানি ওয়া মানাযিলিল কামারি, ৫. কিতাবুসিররি ৬. কিতাবুল মাজালাসাত ইত্যাদি। এইগুলো যে ইমাম মালিক (রহ.) এর সংকলিত ও রচিত গ্রন্থ তা সহীহ সনদে প্রমাণিত। এগুলো ছাড়াও আরাে অনেক গ্রন্থ রয়েছে। 

ইমাম মালিক (রহ.) এর কারাবরণ

ফাতিমিদের সমর্থন করায় আব্বাসি খলিফা আল মানসুর ইমাম মালিক (র) কে কারারুদ্ধ করে ও নির্যাতনের আদেশ দেয়। কিন্তু ইমাম মালিক (র) তাঁর নীতিতে অটল থাকেন। মানসুরের শাসনামলে তাঁর কারাজীবন ও নির্যাতন অব্যাহত থাকে। পরবর্তীকালে খলিফা হারুন-অর-রশীদ তাঁকে মুক্তি দেন এবং যথাযথ মর্যাদা প্রদান করেন।

ইমাম মালিক (রহ.) এর ইন্তেকাল

১৭৯ হিজরিতে ইমাম মালিক (র) ইন্তেকাল করেন। ইমাম মালিক (র) এর মৃত্যুর পূর্বরাতে ইমাম শাফেয়ির (র) ফুফু স্বপ্নে সে অঞ্চলের সর্বশ্রেষ্ঠ ও জ্ঞানী মনীষীটির মৃত্যুর সংবাদ পান। সকালবেলা ইমাম শাফেয়ি (র) তাঁকে ইমাম মালিক (র) এর মৃত্যুর সংবাদ দেন। মদিনার জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন