আল-কুরআনের (Al Quran) পরিচয়

আল কুরআনের পরিচয় - বঙ্গ টুইট - Bongo Tweet

আল-কুরআন লাওহে মাহফুজের অধিপতি মহান আল্লাহর পবিত্র কালাম। এর ভাষাশৈলী, শিল্প সৌন্দর্য সবই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত। আসমানি কিতাবসমূহের মধ্যে এটি সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ। আল-কুরআন সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশস্বরপ এবং পরিপূর্ণ জীবনবিধান। এটি সব আসমানি কিতাবের নির্যাস। এর নাজিলের পদ্ধতিটি ছিল স্বতন্ত্র। কিতাবটি একসাথে নাজিল হয়নি বরং মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স)-এর নবুয়তি জীবনের তেইশ বছরে (৬১০খ্রি.-৬৩২খ্রি.) অল্প অল্প করে নাজিল হয়েছে। 

যখন যে সুরা বা আয়াত নাজিল হয়েছে তখনই মহানবি (স) অত্যন্ত যত্নসহকারে তা মুখস্থ ও আয়ত্ত করে নিয়েছেন। মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স) এর ইন্তেকালের পর ওহি লেখকদের সহযােগিতায় মুসলিম জাহানের খলিফারা পুস্তক আকারে কুরআন সংকলন করেন। মানবজীবনে আল-কুরআনের গুরুত্ব অপরিসীম। মহানবি (স)-এর ওপর নাজিলকৃত কুরআন অবিকৃত অবস্থাতেই পৃথিবীর সর্বত্র বিদ্যমান রয়েছে। এর একটি হরফও কমবেশি হয়নি।

করআন মাজিদের মূল আলােচ্য বিষয় হলাে মানবজীবন। এতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, নৈতিক, সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক, আন্তর্জাতিক তথা সব সমস্যার কল্যাণকর সমাধান দেওয়া হয়েছে। কুরআন মাজিদ তিলাওয়াত, অধ্যয়ন, ব্যাখ্যাকরণ এবং জীবনে বাস্তবায়নের মধ্যেই রয়েছে মানবজীবনের সত্যিকার সফলতা। সর্বোত্তম চরিত্র গঠন ও আদর্শ অনুসরণে আল-কুরআনের কানাে বিকল্প নেই।

আল-কুরআনের পরিচয়

পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহ তায়ালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানুষের ভােগ, ব্যবহার, সুখ-শান্তি, সুযােগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তিনি পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে : তিনিই আল্লাহ, যিনি পৃথিবীর সবকিছু তােমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। (সুরা আল-বাকারা: ২৯)

মানুষকে আল্লাহ অসীম নিয়ামত দান করেছেন। পৃথিবীতে তাকে নিজের খলিফা মনােনীত করে সম্মানিত করেছেন। তাই এখানে তাদের দায়িত্ব হলাে মহান আল্লাহর দেওয়া বিধান মেনে চলা ও সে বিধান বাস্তবায়ন করা। হযরত আদম (আ) প্রথম মানুষ এবং প্রথম নবি। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে আসমানি কিতাব দিয়েছেন যেন তিনি নিজেকে ও নিজের সন্তানদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারেন। পথভ্রষ্ট মানুষের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অসন্তুষ্ট হন। তাদের সঠিক পথ দেখানাের জন্যই তিনি যুগে যুগে প্রেরণ করেছেন অসংখ্য নবি-রাসুল। তাঁরা মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছে দেন।

আল্লাহ তাঁর নবি এবং রাসুলদের কাছে আসমানি কিতাব নাজিল করেন। এ ধারা সৃচিত হয় হযরত আদম (আ)-এর মাধ্যমে এবং এর সমাপ্তি ঘটে হযরত মুহাম্মদ (স) এর মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন যুগে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য যেসব আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন  আল-কুরআন হলো তার মধ্যে সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব।

আল-কুরআনের আভিধানিক পরিচয়

আল-কুরআন' এর বিষয়গত তাৎপর্য ও অন্তহীন গুরুত্বের জন্য আরবি ভাষাবিজ্ঞানীগণ এর নামটিকেও বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করেছেন। কেননা, সর্বশেষ আসমানি কিতাবের এ নাম স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত। তাঁরা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে আল-কুরআনের নামকরণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপস্থাপন করেছেন।

الْقُرْ اٰنُ (কুরআন) শব্দটি দুটি শব্দমূল থেকে গঠিত হয়েছে।

১. الْقُرْ اٰنُ শব্দটি قُرْءٌ শব্দমূল থেকে গঠিত। قُرْءٌ শব্দের অর্থ: পাঠ করা, আবৃত্তি করা ইত্যাদি। আসমানি কিতাবগুলাের মধ্যে কুরআন সর্বাধিক পঠিত, বিধায় একে কুরআন বলে নামকরণ করা হয়েছে।

২. আবার الْقُرْاٰنُ শব্দটি قُرْنٌ শব্দমূল থেকে গঠিত। قُرْنٌ শব্দের অর্থ: মিল, সামঞ্জস্য, একত্র করা ইত্যাদি। কুরআনের একটি আয়াতের সাথে অন্য আয়াতের মিল বা সম্পর্ক আছে বিধায় একে কুরআন বলা হয়।

আশআরীয় ধর্মতত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা আবুল হাসান আল আশআরী (র)-এর মতে : আরবদের উক্তি قَرَأْتُ الشَّىُٔ بِالشٌَ ىِْٔ (কারাতুশ শাইআ বিশ শাই-ই) বা 'আমি একটি বস্তুকে অপরটির সাথে মিলিয়ে দিয়েছি' অংশের قَرَأْتُ (কারাতু) থেকে اَلقُُُرْاٰنُ বূপান্তরিত হয়েছে।) এ মহাগ্রন্থে পার্থিব ও পরকালীন জীবনাচারের সমন্বয় এবং সুরা, আয়াত, শব্দ ও বর্ণের মিলন লক্ষ করা যায়।

বেশিরভাগ ভাষাত্ত্ববিদ ও মুফাসসিরের মতে, اَلقُُُرْاٰنُ শব্দটি নিজেই বাবে فَتَحَ - يَفْتَحُ থেকে قَرَءَ (কারাআ) ক্রিয়ার মাসদার বা ক্রিয়ামূল। কাজেই আল-কুরআন অর্থ; পাঠ করা কিন্তু এখানে শব্দটি مَقْرُوْءٌ বা পঠিত অর্থে ব্যবহৃ হয়। জিবরাইল (আ) মহানবি (স) কে এ মহাগ্রন্থটি পাঠ করে শােনাতেন। তাছাড়া এটি বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ। সূতরাং সাধারণ বিবেচনায় اَلقُرْاٰنُ (আল-কুরআন) শব্দটির মধ্যে আভিধানিকভাবে একত্র করা, সংগ্রহ করা, পাঠ বা আবৃত্তি করা প্রভৃতি অর্থের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

আরও পড়ুনঃ

আল-কুরআনের পারিভাষিক পরিচয়

মুফাসসিরগণ বিভিন্নভাবে আল-কুরআনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। মিশরের ইসলামি গবেষক আল্লামা যারকানী (র) বলেন, 'কুরআন মাজিদ হলাে সে কালামসমষ্টি যা মুতাওয়াতির বা অবিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত, যা তিলাওয়াত করা হয় এবং যার তিলাওয়াত আল্লাহর ইবাদত হিসেবে গণ্য।

ভারতীয় মুসলিম পন্ডিত আশরাফ আলী থানবী (র) বলেন : 'আল-কুরআন হলাে শব্দ ও অর্থ উভয়ের সমষ্টি, এটি মহান আল্লাহর সে কালাম যা তার থেকে হযরত মুহাম্মদ (স)-এর ওপর নাজিল হয়েছে এবং হযরত মুহাম্মদ (স)-এর কাছ থেকে সংশয়হীন পদ্ধতিতে মাসহাফে লিখিত হয়ে আমাদের কাছে পৌছেছে।

আল্লামা আবুল বারাকাত আন-নাসাফী বলেন : আল-কুরআন হলাে আসমানি কিতাব যা হযরত মুহাম্মদ (স)-এর ওপর নাজিল করা হয়েছে। এটি মাসহাফে লিখিত এবং সন্দেহাতীত পদ্ধতিতে ধারাবাহিকভাবে সংকলিত হয়েছে, আর এটি শব্দ ও অর্থের সমন্বিত নাম।

মীযানুল আখবারের রচয়িতা, বায়তুল মুকাররমের তৃতীয় খতিব মুফতি আমীমুল ইহসান বলেন, 'কুরআন মাজিদ এমন এক আসমানি কিতাব যা আমাদের বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (স)-এর ওপর নাজিল হয়েছে। এ গ্রন্থের ছােট্ট একটি সুরার মুকাবিলা করতে সারা দুনিয়ার মানুষ অক্ষমতা প্রকাশ করেছে।

বস্তুত কুরআন মাজিদ আল্লাহর বাণী। এটি লাওহে মাহফুজ থেকে জিবরাইল (আ)-এর মাধ্যমে নবুয়তের দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে মহানবি (স)-এর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে; যা সন্দেহাতীত প্রক্রিয়ায় অদ্যাবধি অবিকল ও অবিকৃত অবস্থায় সুরক্ষিত হয়ে আসছে এবং যার শব্দ, অর্থ, মর্ম, উপস্থাপনা, বিন্যাস সবই আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব।

আল-কুরআনের সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিচয়

আল-কুরআনে ১১৪টি সুরা, ৫৫৪টি রুকু ও ৬২৩৬টি মতান্তরে ৬৬৬৬টি আয়াত আছে। নাজিলের সময় বিবেচনায় কুরআনের সুরাসমূহকে মক্কি ও মাদানি নামে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ৮৬টি সুরা মক্কি আর অবশিষ্ট ২৮টি সুরা মাদানি। অন্য একটি মতে, মক্কি সুরা ৯২টি এবং মাদানি সুরা ২২টি।

জুয: জুয অর্থ অংশ। পবিত্র কুরআন ৩০টি সমান অংশে বিভক্ত। এর প্রতিটি অংশকে একেকটি জুয বলা হয়। জুযকে পারাও বলা হয়।

মানজিল: মানজিল অর্থ- অবতরণস্থল। কুরআন মাজিদকে সাত দিনে খতম (একবার পড়ে শেষ করা) করার সুবিধার্থে সাতটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। এর প্রতিটি ভাগকে একেকটি মানজিল বলা হয়।

কুরআনের সাতটি মানযিল নিম্নরূপ :
  • মানজিল-১: সুরা আল ফাতিহা থেকে সুরা নিসার শেষ পর্যন্ত।
  • মানজিল-২: সুরা আল মায়িদার শুরু হতে সুরা আত-তওবার শেষ পর্যন্ত।
  • মানজিল-৩: সুরা ইউনুস এর শুরু থেকে সুরা নাহল এর শেষ পর্যন্ত।
  • মানজিল-৪: সুরা বনি ইসরাইলের শুরু থেকে সুরা ফুরকানের শেষ পর্যন্ত।
  • মানজিল-৫: সুরা শুআরার শুরু থেকে সুরা ইয়াসীনের শেষ পর্যন্ত।
  • মানজিল-৬: সুরা সফফাতের শুরু থেকে সুরা হুজুরাতের শেষ পর্যন্ত।
  • মানজিল-৭: সুরা ক্বা-ফ এর শুরু থেকে সুরা আন নাসের শেষ পর্যন্ত।
শব্দ সংখ্যা : কুরআন মাজিদের শব্দ সংখ্যার ব্যাপারে তিনটি মত পাওয়া যায়। কতিপয় মনীষীর গণনা মতে, কুরআনের শব্দ সংখ্যা ৭৭৪৩৪টি। অন্যদের গণনা মতে, কুরআনের শব্দ সংখ্যা ৭৭২৭৭টি। আবার কেউ কেউ গণনা করে বলেছেন, এর শব্দ সংখ্যা ৭৭৪৩৭ টি।

  • সুরা ফাতিহা আল-কুরআনের প্রথম সুরা। আর শেষ সুরা আন নাস। করআনের সর্ববৃহৎ সুরা আল-বাকারা। এ্রটি আল-কুরআনের দ্বিতীয় সুরা। এতে ৪০টি রুকু ও ২৮৬টি আয়াত আছে। এ সুরার ২৮২ নম্বর আয়াত কুরআনের সবৃহৎ আয়াত। কুরআনের ১০৮তম সুরা আল-কাওসার হলাে ক্ষদ্রতম সরা। এর ৭৩তম সুরা মুযুযাম্মিলের ২০ নম্বর আয়াত হলাে একমাত্র রুকু যা এক আয়াতসম্বলিত।
  • আল-কুরআনের ৯ম সুরা আত-তাওবা হলাে এমন সুরা যার শরতে তাসমিয়াহ (বিসমিল্লাহ) লিখিত হয়নি। আর ২৭তম সুরা আন-নামল হলাে একমাত্র সুরা যাতে দুবার তাসমিয়ার উল্লেখ রয়েছে।

  • বিন্যস্ত কুরআন মাজিদে সুরাসমূহের ক্রমধারা ও বিন্যাস ওহি দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। আর একে মানজিল ও জুযে বিন্যস্ত করা হয়েছে হাদিসের আলােকে। পরবর্তীতে প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে কুরআনে ই'রাব ও যতিচিহ্ন সংযাজিত হয়েছে।

আল-কুরআনের বিষয়ভিত্তিক আয়াত সংখ্যা :

  • জান্নাতের ওয়াদা-১০০০,     জাহান্নামের ভয়-১০০০
  • আদেশ-১০০০,                   নিষেধ-১০০০
  • উদাহরণ-১০০০,                 কাহিনি-১০০০
  • হালাল-২৫০,                       হারাম-২৫০
  • আল্লাহর পবিত্রতা-১০০,      বিবিধ-৬৬

আল-কুরআনে উনিশ সংখ্যাটির মুজিযা :

কুরআন শরিফের প্রত্যেক সুরার শুরুতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আয়াতটি আছে (সুরা আত তাওবা ছাড়া)। সুরা 'আত-তাওবার শুরুতে বিসমিল্লাহ না থাকলেও সুরা নামলে যেহেতু এই বাক্য দু'বার আছে তাই এর সংখ্যা সুরার সংখ্যার মতাে সর্বমােট ১১৪ই থেকে গেলাে।

  • এই আয়াতটি ৪টি শব্দ এবং ১৯ অক্ষর দিয়ে গঠিত। শব্দ ৪টি হচ্ছে 'ইসম, 'আল্লাহ', 'রহমান, এবং 'রহিম'।
  • সম্পূর্ণ কুরআনের মধ্যে ইসম শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১৯ বার, যা ১৯ দিয়ে ভাগ করা যায়।
  • 'আল্লাহ' শব্দটি কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে ২৬৯৮ বার, এবং একে ১৯ দিয়ে ভাগ করা যায়। 
  • 'রহমান শব্দটি ৫৭ বার ব্যবহৃত হয়েছে, ১৯ দিয়ে একেও ভাগ করা যায়।
  • এবং 'রহিম' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ১১৪ বার, তাকেও ১৯ দিয়ে ভাগ করা যায়। 
  • 'বিসমিল্লাহ'-এর আয়াতটিতে একই অক্ষরের পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে মােট বর্ণ থাকে ১০টি। ১৯ সংখ্যায় ব্যবহৃত অংক দু'টির যােগফল ১+৯=১০।

মন্তব্য করুন

নবীনতর পূর্বতন